কুমিল্লার ব্যস্ত রাজপথ থেকে শুরু করে নিভৃত গ্রাম—বিপদের সময় একটি নামই এখন মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তিনি জাবের হোসাইন। কেউ তাকে ডাকেন ‘রক্তের ফেরিওয়ালা’, কেউ বলেন ‘মানবতার বাতিঘর’। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এক নীরব বিপ্লব আজ হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
জাবেরের পথচলা শুরু হয়েছিল মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত জোগাড়ের মাধ্যমে। আজ অবধি তিনি কয়েক হাজার ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করে দিয়েছেন। তার কাছে প্রতিটি রক্তদাতা কেবল একটি নাম নয়, বরং এক একটি জীবন। ফোনের ওপাশে থাকা কোনো স্বজনের আকুলতা জাবেরকে স্থির থাকতে দেয় না; যতক্ষণ না রক্তদাতার হাত আর রোগীর শিরা এক হচ্ছে, ততক্ষণ জাবেরের বিশ্রাম নেই।
২০২০ সাল, যখন পৃথিবী থমকে গিয়েছিল করোনার নীল বিষে। আপনজন যখন লাশের মায়া ত্যাগ করছিল, তখন জাবের হোসাইন পিপিই কিট পরে হয়ে উঠেছিলেন নির্ভীক ঢাল। গভীর রাতে কাঁধে তুলে নিয়েছেন বেওয়ারিশ লাশের খাটিয়া, পরম মমতায় সম্পন্ন করেছেন দাফন। অক্সিজেনের সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে তার সেই দৌড়ঝাঁপ শিখিয়েছিল—মানুষের সেবার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।
পবিত্র মাহে রমজান এলে জাবেরের রূপ বদলে যায়। ক্লান্তিহীনভাবে তিনি সামলান লাখো মানুষের সেহরি ও ইফতারের আয়োজন। ক্ষুধার্ত মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোই যেন তার জীবনের পরম তৃপ্তি।
আবার ২০২৪-এর প্রলয়ঙ্করী বন্যায় যখন কুমিল্লা ও আশপাশের জনপদ বিপর্যস্ত, জাবের তখন নিজের জীবনের মায়া ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন অথৈ জলে। স্রোতের তীব্রতা তাকে থামাতে পারেনি; ছোট এক নৌকায় করে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন আটকে পড়া অভুক্ত পরিবারগুলোর দ্বারে দ্বারে।
“সমাজ বদলে দিতে বড় কোনো পদের প্রয়োজন নেই, শুধু একটি স্বচ্ছ হৃদয়ের প্রয়োজন।” — জাবের হোসাইন
জাবের আজ আর শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তাকে দেখে আজ বাংলাদেশের হাজারো তরুণ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে মানবিক কাজে। তার একটি ডাকে এখন শত শত স্বেচ্ছাসেবী এক কাতারে এসে দাঁড়ায়।
“যেখানে মানবিকতার ডাক, সেখানেই জাবের”—এই স্লোগান আজ কুমিল্লার গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। জাবের হোসাইন প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা থাকলে একা মানুষই হয়ে উঠতে পারে একটি বিশাল পরিবর্তনের অগ্রদূত।