সংবাদ শিরোনাম
বিশ্ব নদী দিবসে বিশেষজ্ঞরা: ‘চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচাতে হলে কর্ণফুলীকে রক্ষা করতে হবে’ যুক্তরাজ্যে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বাণিজ্য তুলে ধরতে ১ নভেম্বর ‘চট্টগ্রাম উৎসব’ আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লার বিরুদ্ধে জমি দখল ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ নানিয়ারচর সেনা জোনের উদ্যোগে মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন: সনদ প্রদান গাজিপুরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে জামায়াতে ইসলামী নেতৃবৃন্দ একটি ভবনের বিদায়, কিন্তু বন্ধুত্বের নয় (নটর ডেম কলেজের হ্যারিংটন ভবনকে ঘিরে স্মৃতি, ভালোবাসা ও এক প্রজন্মের নস্টালজিয়া) ন্যায় বিচার – লরেন্স ডি. বিশ্বাস টেকনাফে মাদক সেবনের দায়ে রোহিঙ্গার ৬ মাসের কারাদণ্ড বালিয়াডাঙ্গীতে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি, দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীনতার পর স্বস্তির বৃষ্টি, সবজি ও আমন ধানে ক্ষতির আশঙ্কা মানবসেবায় নিঃশব্দ পদচারণা: ইতালীয় মিশনারীদের অবদান ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি – নিকোলাস বিশ্বাস
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন

একটি ভবনের বিদায়, কিন্তু বন্ধুত্বের নয় (নটর ডেম কলেজের হ্যারিংটন ভবনকে ঘিরে স্মৃতি, ভালোবাসা ও এক প্রজন্মের নস্টালজিয়া)

নিকোলাস বিশ্বাস / ১২৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কিছু ভবন শুধু ইট, বালি, সিমেন্ট আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব ভবনের দেয়াল, সিঁড়ি, করিডোর আর জানালায় জমে থাকে মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব ও জীবনের অসংখ্য গল্প। নটর ডেম কলেজের ঐতিহ্যবাহী হ্যারিংটন ভবন তেমনই একটি ভবন – যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নটরডেমিয়ানদের কৈশোর, তারুণ্য ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বৃহত্তর উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নটর ডেম কলেজের পুরোনো ও মূল হ্যারিংটন ভবনটি ভেঙে একই স্থানে একটি নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হওয়ার কথা। ফলে বহু সাবেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি যেন একটি যুগের অবসানের মুহূর্ত।

ভবনটি হয়তো আর থাকবে না। কিন্তু যে স্মৃতিগুলো সেখানে তৈরি হয়েছে, সেগুলো কি কখনো ভাঙা যায়? একজন নটরডেমিয়ান যখন পুরোনো কলেজ ভবনের ছবি দেখেন, তখন হয়তো তাঁর চোখে শুধু একটি স্থাপনা ধরা পড়ে না। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত করিডোর, ক্লাসরুম, সিঁড়ি, ল্যাবরেটরি, মাঠ এবং বন্ধুদের মুখ। মনে পড়ে ক্লাস ফাঁকি, পরীক্ষার প্রস্তুতি, শিক্ষকদের শাসন, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, খেলাধুলা আর জীবনের প্রথম বড় স্বপ্নগুলোর কথা।

NDC ’89 Batch -এর ছবিতে লেখা: “Once Classmates, Forever Family.” এই একটি বাক্যই যেন নটরডেমিয়ানদের সম্পর্কের গভীরতাকে তুলে ধরে। সহপাঠীরা হয়তো আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে আছেন; কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ প্রশাসক বা নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু পুরোনো কলেজ ভবনের স্মৃতি তাঁদের এখনও একই সুতোয় বেঁধে রাখে।

আমিও ১৯৮৯ ব্যাচের ছাত্র। আগামী ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকালে আমরা সদলবলে প্রিয় কলেজ প্রাঙ্গণে যাচ্ছি। ঘুরেঘুরে দেখবো আমাদের প্রিয় ক্লাশ কক্ষ, কলেজ বারান্দা যেখানে আমরা টিফিন পিরিয়ডে হৈহল্লায় মেতে থাকতাম। দেখবো কলেজ মাঠ বিশেষভাবে লতানো গাছে মোড়ানো ভলিবলের মাঠটি আর কলেজের সামনের ফুল বাগান।

কলেজ কর্তৃপক্ষও সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছে – পুরোনো ক্লাসরুম, সিঁড়ি ও প্রাঙ্গণের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে, স্মৃতিগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করতে এবং সম্ভব হলে ছবিতে ফ্রেমবন্দি করে রাখতে।

এই আহ্বান যেন বহু বছরের স্মৃতির দরজা আবার খুলে দিয়েছে। সাবেকদের কেউ লিখেছেন, “অনেক মিস করব কলেজে গেলে।” আরেকজনের কণ্ঠে উঠে এসেছে আরও নির্দিষ্ট স্মৃতি, “ল্যাবগুলো খুব মিস করব।”

কারও কাছে আবার ফিজিক্স ল্যাব মানেই বিশেষ এক স্মৃতি। জিয়া মাহমুদ তমালের কথায় উঠে এসেছে সুশান্ত সরকার স্যারের কাছে শাস্তি পাওয়ার সেই পুরোনো ঘটনা। আজ বহু বছর পর সেই কঠিন মুহূর্তও যেন মধুর স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে। তিনি লিখেছেন, কলেজ জীবনের “হাজারো স্মৃতি” ভোলা সম্ভব নয়।

এই তো নটর ডেমের আসল শক্তি – শুধু শিক্ষা নয়, স্মৃতিও সৃষ্টি করা। এই বিদ্যাপীঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফাদার টিম, ফাদার পিশাতো, ফাদার বেঞ্জামিন, ফাদার বকুল, ফাদার বেনেডিক্ট, ফাদার হেমন্ত সহ মিত্র স্যার, আজহার স্যার, তমাল কান্তি দত্ত স্যার, অমর দাস স্যার, মহিউদ্দিন মল্লিক স্যার, রেজাউদ্দিন স্যার, প্রিয় হামিদ স্যার, গরীব নাওয়াজ স্যার ও প্রমিলা ম্যাডামসহ অসংখ্য শিক্ষক ও কর্মীর স্মৃতি। তাঁদের শাসন, স্নেহ, শিক্ষা ও মূল্যবোধ সাবেক শিক্ষার্থীদের জীবনে যে ছাপ রেখে গেছে, সেটিই আজ নটরডেমিয়ানদের স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রিয় ২১২ নম্বর ক্লাসরুমের কথা বলতে গিয়ে একজন সাবেক শিক্ষার্থী লিখেছেন, “স্মৃতি রোমন্থনের ফাঁদে মায়া বড় বিভ্রান্তকর বস্তু … নশ্বর এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।”

কথাটি সত্যিই গভীর। পৃথিবীতে কোনো স্থাপনা চিরস্থায়ী নয়। পুরোনো ভবন একদিন নতুন ভবনের জায়গা করে নেয়। একটি প্রজন্মের পরিচিত দৃশ্য আরেক প্রজন্মের কাছে ইতিহাস হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের জীবনে যে অনুভূতি, সম্পর্ক ও মূল্যবোধ তৈরি হয়, তার স্থায়িত্ব অনেক বেশি।

হ্যারিংটন ভবনের বিদায় তাই শুধুই একটি ভবন ভেঙে ফেলার ঘটনা নয়। এটি এক প্রজন্মের কাছে নিজেদের ফেলে আসা সময়কে আরেকবার ফিরে দেখার সুযোগ। পুরোনো বেঞ্চ, দেয়াল, সিঁড়ি, ল্যাবরেটরি কিংবা সুপরিসর খেলার মাঠ – সবকিছু হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তোলা একটি ছবি, বন্ধুর সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা, শিক্ষকের স্মরণ এবং পুরোনো দিনের গল্পগুলো হয়ে থাকবে ভবিষ্যতের স্মৃতি।

সময়ের নিয়মে পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানাতেই হয়। উন্নয়ন প্রয়োজন, আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামোও প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি ঐতিহ্য ও স্মৃতির মূল্যও মনে রাখা জরুরি। কারণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু তার ভবন দিয়ে পরিচিত হয় না; তার পরিচয় গড়ে ওঠে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া সম্পর্কের মাধ্যমে।

তাই, হ্যারিংটন ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো অনেক সাবেক নটরডেমিয়ান নীরবে বলবেন –

“বিদায়, প্রিয় পুরোনো ঘর।
তোমার দেয়াল হয়তো থাকবে না,
কিন্তু তোমার ভেতরে গড়ে ওঠা আমাদের গল্পগুলো থাকবে।
তোমার করিডোরে আমাদের পদচিহ্ন মুছে যাবে,
কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব মুছে যাবে না।
তোমার মাঠে হয়তো নতুন প্রজন্ম খেলবে,
কিন্তু আমাদের হাসির প্রতিধ্বনি থেকে যাবে স্মৃতির পাতায়।”

একটি ভবনের বিদায় হতে পারে। একটি যুগের অবসানও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুত্বের নয়। স্মৃতির নয়। ভালোবাসার নয়। জয় হোক বন্ধুত্বের; জয় হোক স্মৃতির!

 

নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর

Categories